সামতান রহমানের গুচ্ছ কবিতা





খাপশীল


নুয়ে পড়া পাহাড়ের চূড়াচিত্র কল্পনা করে চিরতরে মূর্খ হয়ে গেছেন এক নিসর্গবিদ। মরুচারি এক, পাখির ছবি এঁকে, যুক্তিতে আটকে মারা গেলেন।

কপিকারের করা কাঠের পুতুল ছুঁয়ে, দেখলাম; প্রাণ নিয়ে সে নিশ্চল, ছুটে গেল জীবনে।

ডাইসজ্ঞানীরা প্রকাশ হওয়া সেই হাত, নিয়ে গেছে ক্ষোভরঞ্জনে। নিছুঁই দিয়ে বেঁধে রেখে গেছে আর যত স্পর্শ।

অনুরূপা অনেক, প্রাণাপন্ন হয়ে, হারিয়ে যাওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে ছিল, নিজেদের ডাইসে তুলে দেবার আগে।


যা কিছু পারিবৃত্তি, ছেড়ে দিয়েছি। শিখে নিয়ে কুলকৌশল, মেকারের নামে যাচ্ছি। অবিকল ছাড়া কোনো কল, অনুরূপ ছাড়া কোনো রূপ, নাই



সাদাতাড়া



ডুবে আছি কালো গালে, রূপ, রূপায়ণে। পরিক্রমা মনে নাই, ঠিক কতখানে, সাদায়ও ছিলাম সবজির উপরিতল সবুজ করে, রংবিল, অনেক অনেক, ঝকফুলে, কোষ।

পাতা থেকে মাংসে, তরল থেকে হত্যা হয়ে যাওয়ার কঠিন রসায়নে, বদলে গেছি, মেশামেশি হয়ে, [আমার] দেহধারীর নিয়তিরেখায়, বিন্দুবৃহৎ কোষ, এক জীবন থেকে দুই, তিন, অন্যে।

কালো গালে কালো কোষ, আমি, শরীরের; মরেও যাবো, কালো কোষ, শরীরে; যারাঙ্গ তার সাথে থাকি না, দেহ-একক, থাকে না, চিররূপে, কোষ আসে, একই রূপে, কোষ যায়, অন্য রূপে, রূপান্তরে।

যে সৌন্দর্যে আছি, মানুষের দুকখে, কালোয় বিব্রত, এ থাকায় অন্য থাকা রূপ তুলে দেবে, অনুরূপ, তুলে দেয়, একই রঙের, নবকালো কোষ, তুমি জেনো, রক্তপ্রাণ আমি, ছিলাম, এইখানে, চর্মডুবে, সাবান সয়ে সয়ে, উপরিতলের কালোয়, রূপে, বহিরূপে।

সাদানত দেশে, আগ্রহ আনতে, আরও গ্রাহী হবে চেয়ে, [আমার] দেখা যায় অংশে, ঘসেছিলে নির্মম সাবান, সাদাগারে কালোয় কয়েদি হয়ে থাকা আমার মানুষ!

রঙফর্শা করা ক্রিমবিষ উপেক্ষা করে করে, কালো কোষ কালো ছিলাম, কালো আছি, সাদাক্রান্ত, মানুষিক হাস্যকর ও সীমার অন্ত থেকে নির্গত তামশাতোড়ে, আদিসত্য সুন্দরের, রঙ।

তুমি বেঁচে ছিলে আমার দেহঈশ্বর, রূপে, বহুরূপে, যা-কিছু বেঁচে আছো, ঐ রূপেই, রূপসর্বস্বের দেশে।

আমি মিশে ছিলাম বৃক্ষবাকলে, মাটিঅন্তে, অভ্যন্তরে ফলিয়ে দেবার নির্ঘাত নিয়ে, আরও কতখানে, অনুবিভাজনের চ্ছিন্নবাসে, বহু আবিবর্তনের ক্রমায়, আমাকে দেহে নেয়া তোমার কালো রূপে, আছি, বহুগামি, ফিরেও যাবো, ফিরে আসতে, মৃত্যুহাসির নিষ্কাশন দিয়ে, মাটিতেই, প্রকৃত।

ঝকঝকের সাদাতাড়া খেতে খেতে, সাবানভুক, রঙবাদীর দেহে, এই যে মারা যাচ্ছি সাবানে প্রসাধনে, বেশে প্রতিবেশে, সৌন্দর্যসংজ্ঞায়, বর্ণবাদের সৈন্যরা সব মেরে ফেলতে চাইছে উজ্জ্বলে পরিষ্কারে, শুভ্রতায় সাদায়, এখান থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নেবো, কোনো চোখ নাই!


কারাবর্ণ গায়


স্নেহে মারা গেছি ভালোবাসাতেও
অনুগ্রহে গ্রাহ্যতা গেছে মায়াতেও
আশ্রয়ে হারিয়েছি স্থান দাঁড়াবার

তারপর

নৈবেদ্য থেকে উত্থিত নাকচ
ছাতিয়ে রেখেছিল প্রায়মৃতের শ্বাস
তাতেই দমের দেহ দিয়ে
প্রানের সন্ধান পাওয়া গেছে আমি
নয়ত ছিলাম যেন নাই

বাঁচিয়ে রাখে যা
তারে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম এই অপরাধ।


থিতিপড়


হাঁটলে আর স্থির থাকতে পারি না, যাই। যেদিক দিয়েই যেদিকে যাই, হাটে গিয়ে উঠি! হাটে উঠলে, নিজেকে দোকান দোকান লাগে। দোকান খুলে বসি।

কেউ কিছু দাম করে না। তাহলে কি মালপত্র দেখছে না? আরও ঝাঁপ তুলি, মালামাল উঠাই। এবার দেখি, 'আনন্দে পাওয়া' লোকেরাও দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাক চেপে ধরে!

কোথাও ফিরে আসি, প্রতিবারই। ফিরে আসতে গিয়ে একদিন টের পাই, আমার অবিকল এক, পেছন থেকে টান দিয়ে আছে। বলে, 'কই যাও? তোমারে তো কিনছি।'

তার হাতে থেমে গিয়ে বলি, 'আমি তো নিজেরে এখনও বেচাকিনা করি নাই, দামই তো দিতে চায় না কেউ।'

টান ধরে রেখেই বলে সে, 'দাম থাকলে তো কেউ কিছু দরাইতই। আমারও মূল্যসামর্থ্য নাই, বিক্রি করতে এসে একজন, এই দামেই দিয়া দিল তোমারে! হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করেছিলাম তারে, এই নিদামকে নির্মূল্যে বেইচা আপনি কী পাইলেন? বলল, 'মুক্তি!''



পপুলার দিশবাতি



নিজেকে রাখার ভাণ্ড নিয়ে
পিছলে পড়ে গেছি বিচূর্ণে,
নিজেরই দিকানো দিশানো পথে।
প্রবোধ গলে গলে তলানো যাতায়াত
বুকফেরা বৃষ্টিতে গেছে ভেসে,
ছিন্নছি হয়ে আছে ঢকপদ-- ছিলাম-আছি-থাকবো...।


কথা ছিলো বনমোরগের দিকে
দৌড়তে দৌড়তে জিতে যাবো,
বনমোরগ জিতে গেলে
নেমে পড়বো জলে,
মাছের সাথে হব মাছ
ঘাই ঘোল তিড়িয়ে
ছটঝাম জিতে ধরে আনবো মিনতি,
তাও হাত ছাড়া হলে কূল পায়ে যাবো
নিরিহ গাছের দিকে,
যদি পড়ে যাই সে উঁচু থেকেও
আবারও দাঁড়াবো, দৌড়তে,
যতক্ষণ হবে না সে হিম্মত
খুঁজবো পাখির ভুল,
বীজ পুতে ফলের অপেক্ষায় রাখবো জড়িত নিবারণ...।


বহুঘাতে সই হবে যে শরীর
তারে রেখেছি ঘরে, পোশাকে,
স্পর্শগুলোকে করে তুলেছি স্পর্শকাতর,
অনুভুতির তোয়াজ করতে করতে ইন্দ্রিয় প্রবণত।

দেখাদেখি, জ্ঞানত
জাগতিক ভ্রমক্ষেপে
নির্ভরতার কাছে ন্যাস্ত করে
আশংকা তুলেছি,
ভালো লাগার দিকে যেতে যেতে
গুলিয়ে গেছে
যাই-যাবো-যেতে-পারতাম...!


এখন
বাজার থেকে তোমাকে কিনে আনি,
লোকেরা রাজার দিকে চেয়ে থাকে।


মত্ত অমরত্বে


হর মনোহর
জনমনযোগী--
এ সামান্যের, ক্ষুদ্রের
এ পাঠ-পণ্ডিতের
নিয়মগ্রস্থ যে, তার,
আমি এসবে নাই।
অহংকারের মর্তবা জানে না যারা
যারা বিশ্বাস করে আছে সরলরেখার অস্তিত্বে
বরাবর বলে কোনো দিক আছে ধরে যায় যারা
তারা আমার প্রতিপক্ষ!
সমাজ-নিষ্পন্ন সাফল্যে, আমি নাই
কোনো সাব্যস্ত সৌন্দর্যেই আমি নাই।
নিখুঁতে
নিপুণে
হেন সাধারণে আমি তো থাকবো না!

যে প্রবোধই আনো,
হাজার রাজার অমরত্বেও
আমার পোষায় না,
আমি মুহূর্ত বিচক্ষণ বা নির্বিচারি কোনো।

হাসি দিয়ে কেউ অস্কার পায় নি,
প্রেমিকার দিকে
ছুটতে থাকা কেউ জেতেনি অলেম্পিক,
জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে গেলো যে
তারে কেউ জুয়াড়ি চেনে না,
একান্ত পুরুষটির পথ চেয়ে থাকা
নারীটিকে কেউ সাধক মানে না,
কী আছে এখানে এমন
আমারে মাতায়ে রাখে?

সবকিছুতেই সামাজিক ধুলা,
সবকিছুতেই নিয়মি জং...
দরকারের তাড়া খাওয়ারা
সাব্যস্ত হয়েছে সফল,
নিশ্চিত নিরাপদ থাকতে চাওয়ারা
প্রামাণ্য হয়েছে সময়োপযোগী,
মুহূর্তযাপি আমি এসবে কেন?

কী আছে এখানে--
যার দিকে তাকালে চোখ খুলে যায়?
সবাই পোশাকে, গড়নে গহনে
সবাই বিবেচনায়, সাহসে সিদ্ধান্তে
আবেগের লেইম লজ্জা কই?
কানাঘুষা নাই যে জমায়েতে
উস্টা আছাড় নাই যে যাওয়া যাত্রায়
কেলেঙ্কারি ওঠে নাই যে কাজে কামে
তেমন পরিপাটিতে এমন আমি নিরহি নিরহি।

কোনো মা-ই দেখো জেতে নি গ্রামী,
কোনো কৃষক-ই পায় নি জুলি ও কুরি,
আশায় চেয়ে থাকাদের
কেউই সাব্যস্ত হয় নি বুদ্ধ,
প্রত্যাখ্যান করতে পারারা কেউ গণিতো হয় নি যোদ্ধা তুখোড়,
কোনো দাম্পত্যই
নমিনেটেডও হয় নি ফিল্ম ফেয়ারে,
কেনো আমারে এমন গৃহীতির মধ্যে দেখো?

এখনও দেয়ালগুলোর অনায়াস অনাবিষ্কৃত,
প্রতিবন্ধকতাগুলিতে
সম্ভাবনার খোট পায় নি অধিকাংশ আন্দাজ,
অন্ধকার থেকে দেখতে না-পাওয়ার শিক্ষা নিয়েছে যারা,
কি-ভাবে আমি তিষ্ঠবো হে তাদের সভায়?

সবচেয়ে যে দৃশ্য
তাতে দিতে দাওনি চোখ,
সবচেয়ে যা দেখো
তারে রেখেছো লাপাত্তায়।
এ দুরাচারে
নিখিলান্তর আমারে
আর কদমে কৃষ্ণচূড়ায় ডেকো না ডেকো না।

Post a Comment

0 Comments