রাজ-নেতির সাত-সতেরো'র রাজারা
বইয়ের প্রচ্ছদের মতন কৈশোরও জীবনের একটি প্রচ্ছদ। কৈশোর প্রশস্ত জীবনে প্রবেশের চিকন একটি গলিপথ। যে পথের বাঁকে বাঁকে নানা আলপনায়, নানা রঙে- জীবনের নানা স্বপ্ন অঙ্কিত থাকে।
আজ সায়েদ, রইজ, খোকনের কৈশোর নিয়ে কথা বলা শুরু করবো। তারা তিনজন একি ফুলের তিনটি পাপড়ি। একজন ছাড়া অন্যজন নির্গন্ধ, সৌন্দর্যহীন ও অসম্পূর্ণ। তিনজন ছাড়া অন্য কাউকে তাদের সাথে কখনো ঘেষতে দেখা যায় না। গত শনিবার তিনজনই যাবে মৌচাক কাটতে, মঞ্জু আড় ধরেছিল সেও যাবে, প্রয়োজনে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। তবুও তারা রঞ্জুরকে সাথে রাখেনি। বিভিন্ন ছল চাতুরী করে রঞ্জুকে পিছু ছাড়িয়েছিল। তিন একটি বরকতময় সংখ্যা, এ সংখ্যাটি তারা ভাঙবে না।
সেদিন তাদের মধু সংগ্রহের কথা শুনে গ্রামের মুরুব্বিদের অনেকই অনেকভাবে বাঁধা দিয়েছিল, কিন্তু কারোরই বাঁধা তারা তোয়াক্কা করেনি। আর ময়-মুরুব্বিদের এইসব বাঁধা নিষেধ ধাতে না নেওয়ায় জীবনের, নানা সময়ে নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে তাদের।
সন্ধ্যা বেলায় তিন বন্ধু সোটাপীরের ডাঙায় অর্ধশত বয়সী আম গাছটার ডালে ঝুলন্ত মৌমাছির চাক কাটার উদ্দেশ্যে, প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হয়। পূর্ব পরিকল্পনা মতে, রইজ গাছে উঠবে, খোকন খড় ও দা নেবে আর বালটি ও দড়ি ধরবে সায়েদ।
গাছে ওঠা পর্যন্ত রইজের কথা ও মনোবল ছিল খুবই শক্ত-পোক্ত, ডালে বসে যখন খড়ে আগুন দেয়, অল্প অল্প করে পা কাঁপা শুরু করে। নিজেকে শক্ত করে খড় থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া মৌচাকের নিচে লাগানো মাত্র সবগুলো মৌমাছি একই সাথে ভোও ভোও শব্দে জেগে ওঠে। আর রইজের সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করে। সায়েদ তখনোও বালটি প্রস্তুত করেনি, এরই মধ্যে উপর থেকে গরগর শব্দে কিছু একটা পড়ার শব্দ পাওয়া যায়, সায়েদ, তড়িঘড়ি করে বালটি, দড়ি ঠিক করতে করতে খোকনকে এগিয়ে গিয়ে মুখ হা করতে বলে, রইজ গাছ থেকে না, না বলে চেচিয়ে ওঠে। সায়েদ জোরে একটা ধূতকার দিয়ে বলে, 'ওরে ব্যাটা গেন্দিরপু মধু পড়িচ্ছে যে, রইজ কাচুমাচু হয়ে ধীরে নামতে নামতে বলে, ওরে বানচোদ মধু নোহয় মুই মুতি ফেলাইচো।
সময় গড়াবে, বয়স বাড়বে, আপনাদের সামন্যে হাজির হবে তাদের জীবনের খণ্ডবিখণ্ড কিছু চিত্রকল্প। তারা তাদের প্রত্যাহিক জীবন-যাপনে যা কিছু করে প্রত্যেকটি মিনিট এক একটি গল্প। এই গল্পগুলো থেকে আমার দেখা কয়েকটি গল্প আজ আপনাদের শোনানোর চেষ্টা করবো।
দিনটি ছিল সোমবার। স্কুলের মধ্যাহ্ন বিরতির ঘন্টা বাজার সাথে সাথে তারা দিনজন চলে গেল ঢোলোদিঘীর ঘাটে, সেখানে আছে ঐতিহ্যবাহী এক জামগাছ। জামগাছটিতে অসংখ্য পাকাজাম ঝুলে থাকে। জামগাছের নিচে আছে কয়েকটি পুরাতন কবর, কবরের ভয়ে গাছটিতে কেউ উঠতে যায় না। অধিকাংশ জাম পাখিই খেয়ে ফেলে। সেদিন তারা তিনজন পকেটভর্তি প্রচুর জাম স্কুলে এনে সবাইকে ভাগ করে দিচ্ছিল।
সবাই যখন জাম খেয়ে মহা খুশিতে তাদের অদম্য সাহসের প্রশংসা করছিল তখন তারা স্কুলের পিছনে গিয়ে লুঙ্গি ড্যান্স দিচ্ছিল, আর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল এই জন্য যে, কেউ ঘুনাক্ষরে বুঝতে পারেনি এই জামগুলো ছিল তাদের তিনজনের জমানো প্রস্রাবে ধোয়া।
অন্য আরেকদিন চতুর্থ ঘন্টার পরের ঘন্টায় সমাজ ম্যাডাম আসেনি। তাই পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট ক্লাস ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা। এতো দীর্ঘ একটা সময় চুপচাপ বসে থাকা তো তাদের কাজ নয়! তিনজনের পরামর্শে খোকন বলছিল, কাল বাজারের বটতলায় এক ক্যানভেচারের কাছে যাদু শিখে এসেছে, সে এখন এক ফুৎকারে একটি ছোটো পাথর থেকে পাঁচটি ছোটো ছোটো পাথর তৈরি করতে পারে। এবং এই যাদুটা সে প্রতিদিন ক্লাসের একজন করে শেখাতে পারবে। সায়েদ, রইজ ক্লাসের সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। শেষে খোকন আক্কাস কে বেছে নিল। তার হাতে একটা নূড়ি পাথর দিয়ে, শক্ত করে মুষ্টি বেঁধে হাঁটু গেড়ে বসতে বলল, আক্কাস বসার পড় খোকন সমান মন্ত্র পড়ার মতো ঠোঁট নাড়াতে লাগল। ঠোঁট নাড়াতে নাড়াতে আক্কাসের মুষ্টি বাঁধা হাতের পীঠটা কংক্রিটের মেঝের উপর খুব কোষে একটা ঘষা মারল। আক্কাস মা মা বলে গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করে ওঠল। দু'জনের এই কাণ্ড দেখে ক্লাসের সবাই হো হো স্বরে হেসে ওঠল। খোকনের ভাষ্য আক্কাস আর একটু ধৈর্য ধরতে পারলে পাথর তৈরির কৌশলটা রপ্ত করতে পারত। কিন্তু আফসোস! হাসার রোল থামার পর সবাই মিলে খুব দুঃখ প্রকাশ করছিল এই জন্য যে, আক্কাসের হাতের চামরাটা অনেকটা ছিলে গেছে।
আচ্ছা গল্প বলার ছলে আপনাদের সময় নষ্ট করছি না তো? খুব অস্বস্তি অনুভব করছি, এই গল্পগুলো আমার মনে যতোটা হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। ভাব, ভাষা ও বর্ণনায় ততোটা রসবোধ কি আমি আপনাদের মনে সঞ্চার করতে পারছি? সাথে থাকুন এর থেকেও ভালো কিছু বলার চেষ্টা করছি।
যখন তারা অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ছাত্র বলাটা ঠিক হচ্ছে কিনা জানি না। আমরা তো কোনো একজন স্কুলে ভর্তি হলেই ছাত্র বলি, নিয়মিত স্কুল যাক আর না যাক, পড়তে বসুক আর নাই বসুক। এই তিনজনের মাথায় পাশ ফেলের চিন্তা কখনোই ছিল না। মন চলছে স্কুলে গেছে, না চললে যায় নি। যাক সে কথা, যে কথা বলতে যাচ্ছিলাম।
তারা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এলাকায় বিপুলভাবে সিটি চালানোর ধুপ পড়ে গেল। তারাও সিটি আনবে বলে সবার বাড়ি বাড়ি টাকা, চাল, আলু, এবং কি মাচার লাউটা পর্যন্ত নিয়ে আসল। কথা ছিল 'বেদের মেয়ে জোছনা' 'ছুটি' 'হৃদয়ের বন্ধন'সহ সাবানা জসিমের বাচাই করা কয়েকটা সিনেমা নিয়ে আসবে। আর এনে বসাবে ওয়াক্তিয়া মসজিদের সামনে। মসজিদের কথা শুনে মরুব্বি গোছের কয়েকজন দ্বিমত করল, কিন্তু এর থেকে যুতসই কোনো জায়গার মতামত কেউ দিতে পারল না, বিধায় উক্ত জায়গায় নির্ধারণ হলো যেখানে এলাকার সবাই একত্রিত হয়ে মনোযোগের সাথে শান্তিতে বসে সিনেমাগুলো দেখতে পারবে। ঠিক সন্ধ্যার পরপর তিনজনই সিটি নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় হাজির হলো, কিন্তু অনেক মহিলারই রান্না, খাওয়া, দুধের শিশুকে ঘুম পাড়ানো হয়নি। সিদ্ধান্ত হলো এশার নামাজের পর আরাম্ভ করা হবে। এশার নামাজের পর , শিশু, বৃদ্ধ, যুবক যুবতীসহ প্রায় শ'খানে মানুষ। সবার আগ্রহে প্রথমে 'বেদের মেয়ে জোছনা চলানো হলো। কিন্তু সিটি পেয়ে প্রত্যেকের ভেতর যে পরিমাণ উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা গেল। বেদের মেয়ে জোছনা শেষ হতে না হতেই তা অনেকাংশে স্তমিত হয়ে গেল। সিটি ডিক্সগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় ঠিক মতো চলছে না পুতুল খেলার মতো হাত, হাঁটু, কোমড় ভেঙে আটকে যাচ্ছে। ওটা কোনো প্রকার শেষ করে 'ছুটির ঘন্টা' শুরু করল, খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হলো এটা আবার একদমই চলছে না। এটা ওটা করতে করতে ভুল বসতঃ এমন একটা ডিক্স চালানো হয়েছে, তাতে যে দৃশ্য ভেসে উঠল তা দেখার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে তিনটি উলঙ্গ বিদেশী পুরুষ, একটি মেয়েকে উলঙ্গ করার চেষ্টা করছে। আর মেয়েটি অতি আনন্দে শরীরের পোশাকগুলো খুলতে পুরুষ তিনটিকে সাহায্য করছে। তড়িঘড়ি করে বন্ধ করতে গিয়ে সিটি ডিক্স এমন করে আটকে গেলো, আর কোনো প্রকারই বের হচ্ছে না। যুবতী মেয়েরা, ঘরের বৌয়েরা যে যেদিকে রাস্তা পেল দৌড়ে পালালো। মুরুব্বি শ্রেণির কয়েকজন ঐ তিনজন কিশোরকে ধরার জন্য পাগলা ষাঁড়ের মতো তাড়া করলো। কেউ কেউ টিভি, সিডি, সিডি ডিক্স ভেঙে চুরমার করে দিল। আর ছোটো শিশুরা টিভিতে সিনেমা দেখার পরিবর্তে সরাসরি সার্কাস দেখতে লাগল।
খোকন, সায়েদ, রইজ কে যে কথায় পালাল দিন পনেরো তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
এদিকে বিষয়টা ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত গড়ালো। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিডি মালিককে ডেকে ইচ্ছে মতো জব্দ করে ছোটো ছোটো শিশু কিশোরদের অশ্লীল ছবির ভিডিও বিনিময় করার কারণে তার সিডি সেট বাজেয়াপ্ত করে, হুশিয়ারি দিলো যে, এ নিয়ে সে যদি কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করে তাহলে বিষয়টা থানা পুলিশের মাধ্যমে সুরাহা হবে।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, এই ছেলেদের কি বাবা-মা পরিবার-পরিজন নেই। তাঁরা কি তাদের শাসন-বাড়ন করেন না? বাবা-মা পরিবার পরিজন শুধু নয় ইতিমতো এলাকায় শালিস ডেকে কতোবার যে তাদের পিটানো হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। আমি এমনও দেখেছি তিনদিন পর্যন্ত তাদের ভাত দেওয়া হয়নি, সাতদিন পর্যন্ত বেঁধে রাখা হয়েছে। তখন যারা নালিশ করেছে, তারাই এসে বলেছে, ছোটো ছেলে ভুল করেছে কি আর করবেন, মেরে ফেলে তো আর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া যায় না। হয়েছে ছেড়ে দেন। আর এমন করবে না। খোকন, রইজ আর সায়েদের বাবা মাকে তাদের ছেলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এতো বেশি লাঞ্চিত, অপমাণিত ও বেঈজ্জতী হতে দেখেছি, এখন তাদের বিষয়ে বলতে গেলে, শুধু তাদের চোখের জলের ধরণ সম্পর্কে বলা হবে। কারণ এই তিনজনকে নিয়ে এতো বেশি বিচার, সালিশ ও মারপীঠ হয়েছে। আর তাদের বাবা মায়েরা অন্যের হুমকি-ধামকি ও দাবরাণী এতো বেশি শুনেছে যে, এখন তাদের নিভৃতে নির্জনে কান্না করা ছাড়া আর কোনো কিছু করার নাই।
অনেকদিন পর তারা যখন গ্রামে ফিরল দু'চারজন ভাসমানভাবে দু'চার কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। তারা এতোদিনে যা ভেবেছিল তা অনেকাংশে আচ্ছাদিত হয়ে গেছে।
এরপর দীর্ঘদিন ছোটো খাটো দু'একটা ঘটনা ছাড়া বিচারিত কোনো ঘটনায় তাদেরকে দেখা যায়নি।
এর মধ্যে ঘটে যাওয়া একটা ছোটো গল্প বলি। প্রকৃতিতে চলছিল শীতকাল। প্রকৃতি কুয়াশার সাদা শাল চাদর গায়ে বুড়ো মানুষের মতো মুখ থুপরে চুপচাপ পড়ে আছে।স্কুল ছুটি। বগুলাডাঙি জঙ্গলটা পেরিয়ে গেলে ওপাশে মস্ত বড় এক আখ খেত। দীর্ঘদিনের ফুটকি, ভাঁটিগাছের শিখর উগড়ে এবারই প্রথম আখ চাষ করা হয়েছে।লম্বা মোটায় আখগুলোও হয়েছে অসাধারণ। তারা তিনজন নিশ্চুপ নিঃশব্দে শীতে শরীর ভিজিয়ে আখ খেতের ভেতর ঢুকে, সবচে' বড় ও নরম আখগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। এদিক ওদিক চোখ ঘুড়াতেই দেখতে পেলো আখ খেতের ঠিক মাঝখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে কাঁশফুল। কাঁশফুলের ভেতর অনেকগুলো মোটা আখ ভেঙে তার উপর পা ছড়িয়ে বসে
মনের সুখে রস পান করছে এলিয়াস। খোকন ও রইজকে নিশ্চুপ বসে থাকতে বলে, সায়েদ চুপিচুপি এগিয়ে এলিয়াসের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল, গলার আওয়াজ একটু মোটা করে বলতে লাগল, এই ছেলে তোর বুকে কি ভয় ডর নেই, কুয়াশায় ভেজা এই নির্জন আখ খেতে একা একা আখের রস টানছিস! এলিয়াস প্রথমে ভরকে গেছিল, পরক্ষণে সায়েদকে
দেখে মৃদু হেসে বলল, কিরে মামুর ব্যাটা আর লোক প্যালো নাই, মোক ডর খিলিবা আসিচু, তুই জানিস না, মুই কুনু কিছুক ডর পাউ না।
সায়েদ চোখ দুটো বড় বড় করে ডানে বামে উপরে নিচে পরপর কয়েকবার ঘুরিয়ে পূর্বের ভঙ্গিতেই বলতে লাগল, আমি তোর মামুর ব্যাটা নইরে, আমি সায়েদের রূপ ধরে তোর কলিজাটা ছিঁড়ে খেতে এসেছি। আমি ঐ বগুলাডাঙার শ্যাওড়া গাছটার দেবতা কঙ্খর।
এলিয়াসের বুকটা ধক করে উঠল, অনেকের কাছে শুনেছে ঐ ঝোঁপওয়ালা শ্যাওড়া গাছটাতে কঙ্খর নামে এক দেবতা থাকে। পাড়ার বেশ কয়েকজনকে ছলনাও করেছে। এলিয়াসের বুক ধুকপুক করতে শুরু করল। তবুও কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে আগের হাসিটাই মুখে ধরার চেষ্টা করে বলল, কঙ্খর হইছি তো ল্যাটা হইছে, এলা মোর হোলের বাল্লা ছিঁড়ি দে।
সায়েদ এলিয়াসের পিছন থেকে একটা মোটা আখ নিয়ে, সাপাং সাপাং ইলিয়াসের পীঠে দু'ঘা বসিয়ে দিলো! এলিয়াস বাপুগে মাগে বলে, চিল্লানি দিয়ে এমন দৌড় ছুটল, মনে হয়, কোনো প্রকার আখ খেত পার হতে পারলেই জানে বাঁচে। ওদিক রইজ, খোকন এমন দৃশ্য দেখে হাসতে হাসতে প্রায় পেট ফেটে মরে যায় যায় অবস্থা।
তাদের হাসি থামলে, তিনজন মনের সুখে ইলিয়াসের আখগুলো নিয়ে মিষ্টি রসে গলা ভেজাতে লাগল।
আমার মনে হয়েছে, একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে মানুষ হাসতে ভুলে গেছে। প্রাণ খুলে হাসার যে নির্মল আনন্দ, ও সৌন্দর্যের প্রয়োজন সেটা আজকের পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পাঠক এই গল্পটায় একটা প্রাণবন্ত, নিষ্কলঙ্ক হাসির
খোরাক পাবে। বাংলা নাটক বা কৌতুকের মতো পাছায় আঙুল দিয়ে জোর করে হাসানোর আপ্রাণ চেষ্টার ছিটে ফোটাও এখানে থাকবে না। আবার কোনো পাঠক এ গল্পটাকে নিচক রম্য রচনা বলে উড়িয়ে দিতেও পারবে না। এ গল্পের মাঝখান দিয়ে ক্লিপ রেখার মতো বয়ে গেছে কান্নার এক অদৃশ্য রেখা। প্রতিটি হাসির পরপরই একটা নীরব কান্না
আছে, যে কান্নাটা এখানে ঈঙ্গিত মাত্র। যেমন বড়ভাই ফয়জুল এ তিন লাফাঙ্গা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করেছিল, একদিন এরা বিশ্ববিখ্যাত চোর 'কুচ ক্যাসিডিকেও' হার মানাবে এবং অর্ধেক জীবন জেল কারাগারের ভেতরে কাটাবে বড়ভাই ভয়জুলের এমন বাণীতে তারা মর্মাহত হয়েছিল। এই সামান্য কথায়, এক ভোরে তারা তিনজন ফয়জুল
ভাইয়ের টিউবওয়েল পাড়ের পাতা ভর্তি কাঁঠাল গাছটিতে ঠাঁই নিয়েছিল। তার বউ যখন ফরজ গোসল করার জন্যে টিউবওয়েল পাড়ে আসে, তারা ছোটো একটা বাটন ফোনে খুব পারদর্শিতা সাথে গোসলের ভিডিওটি ধারণ করে। পোশাক খোলা, সাবান লাগানো, আবার পোশাক পড়া পর্যন্ত এগারো মিনিট সাতাশ সেকেন্ডের এই সামান্য ভিডিওটা করতে তাদের নাকি ঐ কাঁঠাল গাছটিতে ওঠে প্রায় ছয়টা ভোর অপেক্ষা করতে হয়েছে।কোনোদিন ভোর হওয়ার আগেই অন্ধকারের ভেতরই গোসল শেষ করে ফেলেছে। কোনোদিন এতোটা ভোর হয়েছিল যে, তাদেরকেই কিনা দেখতে পায়। তারপরও সেদিনের সেই ভিডিওটিতে আলো আঁধারির মধ্যে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে অপরিচিত কেউ আন্দাজ করতে
পারবে না এটা ফয়জুল ভাইয়ের বউ। পরবর্তী সময়ে এই ভিডিওটি নিয়ে তাদের যৌন জীবনে যে কী পরিমাণ কাহিনী তৈরি হয়েছিল, এটা এখানে বলার বিষয় নয়। এই গল্পটা বলার প্রয়োজন পড়ল এই জন্যে, তাদের জীবনে যে কান্না লুকিয়ে আছে এ গল্পটার ভেতর তারই ঈঙ্গিত দেওয়ার আছে।লোকে বলে, 'পাপ কথা ছাপ থাকে না' এই ভিডিও কোনো না কোনোভাবে ফয়জুল ভাইয়ের কাছে পৌঁছেছিল। ফয়জুল ভাই এই ভিডিও দেখে যতোটা না দুমড়ে মুছড়ে গিয়েছিল, তার থেকে বেশি কান্নায় ভেঙে পড়েছিল তার বউ। তাদের বড় মেয়েটা কলেজে পড়ে, ছোটো ছেলেটা হাই স্কুলে, এই বয়সে এসে এমন একটা ঘটনায় ছেলে মেয়েদের নিয়ে সমাজে কী করে মুখ দেখাবে। ফয়জুল এই তিন কিশোর, তাদের মা-বাবাসহ পরিবারের প্রত্যেকের নামে মামলা করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এলাকার চেয়ারম্যান এসে ফয়জুলকে
ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে বলে। বিষয়টা থানা কোর্ট পর্যন্ত গড়ালে তারই সম্মানের ক্ষতি হবে সবচেয়ে বেশি। চেয়ারম্যানের ভাষ্য ছিল, যদি ফয়জুল তার উপর ভরসা রাখে, তাহলে সে সমচিত একটা বিচারের ব্যবস্থা করবে।
সবদিক বিবেচনা করে ফয়জুল বিচারের ভার চেয়ারম্যানের উপরে ন্যাস্ত করে। সেইদিনকার বিচারে সেই তিন কিশোরেই যে মার খেয়েছে তা নয়, ছেলেদের যথার্থভাবে মানুষ করতে না পারার দায়ে তাদের বাবাদেরকেও চেয়ারম্যানের হাতে চড় থাপ্পরসহ এলাকার সকলের কাছে অপদস্ত হতে হয়েছিল। তবে সায়েদ, রইজ, খোকনকে এতো বেশি পিটানো হয়েছিল যে, তারা কেউ তিনদিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত
রইজকে তো সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চেয়ারম্যান রইজের উরুতে বুটজুতোর চাপ দিতে গিয়ে পা ফসকে চাপ পড়েছিল তার অণ্ডকোষের উপর। এরকম প্রতিটি গল্পের পিছনে, কিছু না কিছু কান্না আছে, কিন্তু সে কান্না দিয়ে
গল্পটা ভারী করার ইচ্ছে নেই, শুধু গল্পের মতো একটি গল্প, যার কোনো পরিণতি নেই। শিক্ষা নেই। শিক্ষা নেই বললে ভুল হবে। শিক্ষা নিতে চাইলে, একটি মাকরশা, একটি তেলাপোকার কাছেও আমাদের অনেক শেখার আছে। ভূমিকা করে সময় পার করতে চাই না। চলুক আরও একটা চমকপ্রদ গল্প শুনি।
রইজ সায়েদ ও খোকনদের স্কুলে বিজয় দিবস উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে। সেই অনুষ্ঠানে তারা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা নাটিকা করবে। এই নাটিকাটির লেখক জেলাস্কুলের বাংলা স্যার। এই নাটিকাটির জন্য গ্রাম থেকে সাইকেল মেরে ১০ মাইল রাস্তা অতিক্রম করে জেলা শহরে বাংলা স্যারের কাছে প্রায় তিন থেকে চারদিন গেছে নাটিকাটির জন্য। নাটিকাটি মহড়াও করেছিলেন প্রায় দিন সাতেক। অন্যান্য স্যারদের সাথে হেড স্যারও মহড়া দেখে বলেছিলেন, নাটিকাটি মঞ্চস্থ হলে মন্দ হবে না। অথচ প্রচুর ইভেন্ট থাকার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শেষ করা যাবে না বলে, হেড স্যার তালিকা থেকে নাটিকাটির নাম বাদ করে দিলেন। এ কথা শুনে, ভয়ংকর হয়ে উঠল তারা তিনজন। চড়াওভাবে প্রচার করলেন, তাদের অভিনয়ের সুযোগ না হলে অনুষ্ঠান করার সুযোগও হবে না। যেমন কথা তেমন কাজ। অনুষ্ঠানের দিন স্কুলের বারান্দার সামনে স্টেজ তৈরি করা হয়েছে। অতিথিতের
বক্তব্য চলছে, এরপর পুরষ্কার বিতরণী, পুরষ্কার বিতরণী শেষে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। সামনে উপস্থিত জেলা উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা। বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য ভালো ভালো কণ্ঠ ও নৃত্য শিল্পী নিয়ে আশা হয়েছে। রইজ, খোকন, সায়েদ ওঁৎ পেতে আছে স্কুলের পিছনে, প্রত্যকের হাতে একটা করে পলেথিনের প্যাকেট, প্যাকেটে পানির সাথে ডাইলেশন করা মানুষের পায়খানা। যখন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা শুরু হলো, তখনই তিনটা পাতলা পায়খানার
পলেথিন একই সাথে গিয়ে স্টেজ, অতিথি মঞ্চ, দর্শকদের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। এরপর পরিস্থিতি কী হয়েছিল আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু এইটুকু বললেই চলবে, সেই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় শত শত মানুষের মধ্যে বমির একটা প্রতিযোগিতা উঠেছিল। এইসব অদ্ভূত বুদ্ধি তাদের কে দেয়? কোথা থেকে পায়? তারা ছাড়া এক উপরওয়ালায়
বলতে পারবেন। অন্য কোনো মানুষের পক্ষে বলা তো দূরে থাক কল্পনায় আসাও তো সম্ভব না। এ ঘটনার পর তারা যে বাড়ি ছেড়েছিল, বাইরে বাইরে ঘুরে বেরিয়েছিল প্রায় তিনটি বছর।
আর এদিকে তাদের নামে কিশোর অপরাধে একটা মামলা ঋজু হয়েছিল। পুলিশ তাদের নামে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি করে সবদিকে তন্ত তন্ত করে খুঁজে বেরিয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে ধরা তো দূরে থাক, টিকিটারও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
গল্পটা এখানেই শেষ করতে পারতাম। কিন্তু এখানে শেষ করলে গল্পটি হবে একটি কিশোর গল্প। কিন্তু আমি এ গল্পটিকে কোনো প্রকারে একটি কিশোর গল্প বলে চালাতে রাজি নই। আমি এই তিনজনকে নিয়ে একটা পূর্নাঙ্গ গল্পেই বলতে চাই। তাই আপনাদের নিয়ে যাবো তাদের ফিরে আসা পর্যন্ত। এতোদিনে তারা পূর্ণ যৌবনে
পদার্পণ করবে।
যেদিন তারা একসাথে গ্রামে ফিরে আসে সেদিন সমস্ত গ্রাম ভেঙে তাদেরকে দেখতে গিয়েছিল। গ্রামবাসীসহ তাদের পরিবারের প্রত্যকের নিশ্চিত ধারণা ছিলো, হয় তারা হারিয়ে গেছে, নয়তো কোনো দুর্ঘটনায় মারা গেছে। এ দু'টো নিয়ে মাঝে মাঝে দু'একজন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেও তারা যে আর কোনোদিনও গ্রামমুখী হবে না এ
ব্যাপারে কাউকে দ্বিমত হতে দেখা যায়নি।
গ্রামে ফিরে তারা কয়েকদিন ভালোভাবেই চলাফেরা শুরু করল। আর তাদেরকে ঘিরে গ্রামবাসীর সকল কৌতূহলও বন্ধ হলো। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর জানা গেলো এতোদিনে তারা সিগারেটের পাশাপাশি গাজাও টানতে শিখে গেছে।
আরও অল্পকিছুদিনের মধ্যে মহল্লার মানুষজন আবিষ্কার করল, তারা নয়াদিঘীর পাড়ে, ঘন বাঁশঝাড়ের নিচে পুরো একটা আস্তানা খুলে বসেছে। সেখানে গিয়ে গাজা টানে, আর মাঝে মধ্যে খারাপ মেয়েছেলে এনে সারারাত ফূর্তিবাজী করে। সমস্ত ব্যাপারটা প্রকাশ পেলো সেদিন।
যেদিন আটোয়ারি থেকে ভাড়ায় খাটা এক মধ্যবয়স্ক মহিলাকে নিয়ে এলো। তারা এই মহিলাকে আশ্বস্ত করেছিল তাকে তাদেরই কারও একজনের বাড়িতে নিয়ে যাবে। কিন্তু নিয়ে এসেছে পুরোনো এক দিঘীর পাড়ে। তাও আবার আসন তৈরি হয়েছে বস্তার ছেঁড়া ছালার উপর। এই মহিলা কোনোভবে বসার অযোগ্য স্থানে রাত কাটাতে নারাজ। এমনতাবস্থায় ধস্তাধস্তি করে রইজ ও সায়েদ পেড়ে উঠলেও খোকন পাড় হতে পারেনি। মহিলাটির অভদ্র ব্যবহারে খোকনের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল অজানা এক ভয়। ভয়ের কারণে উবে গেছে শরীরের সব উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত খোকন আশ্রয় নিয়েছিল মুখের থুথু ও লালার। এই হয়েছে কাল। মহিলাটি এবার দোলা মোচা করতে করতে বিরবির করতে থাকে, এই জাউরার ব্যাটা কি করছিস? এই গোলামের পুত কি লাগাইছিস? জ্বলে গেলগে বাপু, পুড়ে গেলগে মা। বিরবির করতে করতে গলাবাজি চিৎকার!
সায়েদ খোকন রইজ মহিলাটিকে ফেলে দৌঁড়ে পালাতে বাধ্য হয়। পরে সায়েদ ও রইজ, খোকনের শার্টের কলার চেপে ধরলে আসল ঘটনা বুঝা যায়। সে আসার সময় হোটেল থেকে বয়লার মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে এসেছিল। মাংসে মরিচের ব্যবহার ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।
এই নিয়ে গ্রামে আবার হট্টোগোল। আবার তারা কয়েকদিন বাড়ি ছাড়া।
এরই মধ্যে হয়তো বোদ্ধা শ্রোতার মনে একটা বিষয় বদ্ধমূল হয়ে গেছে, মানুষ তো দোষগুণের সমাহার অথচ আমি যা বয়ান দিচ্ছি তা তো শুধু দোষের আকড়। তার মানে তারা কি তাদের জীবনে কোনো ভালো কাজে অংশগ্রহণ করেনি? গ্রামের আর দশজন সাধারণ মানুষ তাদেরকে যে চোখে দেখেছে আমিও সে চোখে দেখার চেষ্টা করছি। মনে রাখা দরকার কেউ যদি সব সময় বড় বড় অন্যায় করতে থাকে, আর মাঝে মাঝে দু'একটা ভালো কাজ করে, তাহলে সেই ভালো কাজগুলো কর্তাব্যক্তির চোখে বেশি বেশি ধরা পরলেও দর্শকের চোখে বড় বড় অন্যায়গুলোর নিচে ঢাকা পড়ে
যায় ছোটো খাটো ভালো কাজগুলো। এই মুহূর্তে তাদের যে দু'একটা ভালো কাজের কথা মনে পড়ছে। তা বলে আপনাদের মনে দাগ কাটতে পারবো না বলে, অযথা গল্পটা দীর্ঘ করে আপনাদের বিরক্তিও দীর্ঘ করতে চাই না।
আসুন আর একটু এগিয়ে যাই–
এখান থেকে ভারত কাছাকাছি হওয়ায় তারা এবার ঢুকে পড়ছে ভারতের ভেতর। আপনারা জানেন মদ, ফেন্সিডিল গাজা কাঁটাতার ডিঙিয়ে ভারত হয়েই বেশি প্রবেশ করে বাংলাদেশে। ভারতে এসব বস্তু খুব সুলভ মূল্যে যাওয়া যায়। তাই দেখা গেছে বিশেষ করে গাজা কিনতে তারা রাতের অন্ধকারে, গভীর কুয়াশায় অথবা ঝুম বৃষ্টিতে বিজিবি, বিএসএফ'র চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ে। ব্লাকের মাধ্যমে গরু, বাই-সাইকেল, মোবাইল, সার-কীটনাশক, ঔষধ ছাড়াও নানাবিধ দ্রব্যাদি বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এই তিনজন পরবর্তী সময়ে এসব জিনিসপত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল কিনা আমার জানা নেই। একটা জিনিস আমি তাদের মধ্যে লক্ষ করেছি, টাকার প্রতি লোভ বা
মোহ তাদের কোনো দিনও ছিল না। কোথাও কারো কিছু চুরি করে ধরা পড়েছিল, সে কথাও কখনো শুনিনি।
যাক সে কথা। যে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি একদিন বিএসএফ তাদের খুব জোরে দৌড়ানি দিয়েছিল। শোনা গেছে কয়েক রাউন্ড গুলিও করেছিল। ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছে। এবার তিনজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলো বিএসএফকে আচ্ছা মতো শায়েস্তা করবে। সেদিন সারারাত তিনজন মিলে ভাবছিল কি করা যায়।
ছোটো একটি জলের নালা ভারতের কাঁটাকারের নিম্নাংশ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। নালাটার উপর একটি কালভাট, ওটাকে আমরা শানঘাট বলেই জানি। জায়গাটায় বর্ষাকালে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু বিএসএফ এর অত্যাচারে কোনো বছরেই মাছ ধরা হয় না। রাতের অন্ধকারে ফাঁদি জাল ফেললে সকাল এসে দেখবেন বিএসএফ নিয়ে চলে গেছে অথবা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলছে। আবার কালভাটের দুইপাশে গভীর জঙ্গল থাকায় এদিক দিয়ে নিরাপদে মালামালও ফাঁসানো যায়। কিন্তু কয়েকদিন নিয়ে দু'চারটা বিএসএফ ওখানেই এসে আড্ডা বসায় প্রতিদিনরাত। খোকন, রইজ, সায়েদ ওখানেই অপারেশন চালানোর অপেক্ষায় পাশের একটা নিঝুম ঝোপঝাড়ের
নিচে বসে আছে।সারাদিনের প্রচণ্ড রৌদ্র তাপে মনে হয় গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত নিস্তেজ হয়ে গেছে। একটা পাতাও নড়াচড়া করতে পারছে না। টপাটাপ ঘাম ঝরছে তিনজনর শরীর থেকে। এপাশে একটু এদিকওদিক হলে ব্রাশ ফায়ারে নিশ্চিত মৃত্যু। তিনজন তাকিয়ে আছে শত্রুদল আসার রাস্তাটার দিকে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে দেখা
গেল বিএসএফ এর ছয় সাতজনের একটা দল এগিয়ে আসছে, এগিয়ে আসছে সন্ধ্যাও। সায়েদ-রইজ বাঁশে ঝুলন্ত বস্তাটা দু'জন দুপাশে ধরে কাঁদে তুলে নিলো। সামনের জঙ্গল পাশ কেটে এগিয়ে গেলো খোকন। দুই শত্রু দলের একে অপরকে আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছে। এদের তিনজনকে দেখে রাইফেল কাঁধে তুলে হল হল করতে করতে দৌড়ে
আসছে বিএসএফরা। এরা তিনজন বস্তাটা ফেলে দিয়ে যে যার মতো জঙ্গলে হারিয়ে গেল। বিএসএফরা বস্তার সামনে এসে দাঁড়ায়ে গভীর শ্বাস নিচ্ছিল আর ভাবছিল বস্তার ভেতর কী? দেখার জন্য বস্তা মুখ খোলা মুহূর্তেই শতশত ভীমরুল বেরিয়ে এসে হুল ফুটাতে লাগল প্রত্যেক বিএসএফ-এর মাথা মুখসহ সমস্ত শরীরে। আর চিৎকার চেচামেচিতে আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল সমস্ত এলাকাটা। জঙ্গলের ভেতর থেকে এ দৃশ্য দেখে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করল তিনজনই।
এ বুদ্ধিটা দিয়েছিল রইজ। একদিন কালিতলার বাঁশঝাড় থেকে গরু আনতে গিয়ে, তাকে একটা ভীমরুল হুল ফুটেয়েছিল। এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করতে করতে সেদিন চোখে পড়েছিল দুইটা কঞ্চির উপর ভর করে ঝুলে থাকা ভীমরুলের বাসাটা। রাতের অন্ধকারে বড় একটা প্লাস্টিক বস্তার ভেতর ভীমরুলের বাসাটা ঢুকিয়ে মুখে শক্ত করে
গিঁট মেরে কঞ্চি দু'টো কেটে বয়ে এনেছিল এ পর্যন্ত। সায়েদের চোখে ছিল এটা একটা অত্যাধুনিক বহ্মাস্ত্র।
আরো কিছু গল্প শোনা যেত। কিন্তু রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। গল্পটাও আকারে বড় হচ্ছে। এরপর আপনাদের বিরক্তিও বেড়ে যাচ্ছে কিনা জানি না। বেশি সময় নিয়ে কথা বললে, ভালো কথাও তেঁতো লাগে। অপরদিকে ভাবতে হবে মানুষের সময় কমে আসছে, আবার ব্যস্ততাও বেড়ে যাচ্ছে। তাই যা বলার শর্টকাটে বলা ভালো এক বাক্যের কথা
দশ বাক্যে বলার দিন শেষ। ওহ! এছাড়া আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। আগামীকাল সকালবেলা এক বিজয় মিছিলে যোগ দিয়ে সারাদিন শ্লোগানে-নেচে-গেয়ে কাটাতে হবে রাস্তায়। আমার এক বড় আব্বাত ভাই উপজেলা নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। গত দুইদিন ধরে বিজয় মিছিল চলছে। আগামীকালও চলবে।শেষে এটুকু না বলে পারছি না, আমার এ গল্পের অনুপ্রেরণা এই বিজয়ী চেয়ারম্যান। এক সময় সেও ছিল এই তিন কিশোরের মতো দূরন্ধর। গ্রামের মানুষ তার সাথে পেড়ে উঠতে না পেরে পথের মোড় পরিবর্তনের জন্য প্রথমত পরিষদ মেম্বার নির্বাচিত করেছিলেন। সে এখন সদর পরিষদ চেয়ারম্যান। এটাই আমাদের দেশ। এটাই রাজনীতি। এটাই নিয়ম। কি বুঝছেন তো!?
.png)
0 Comments