কে?
‘হয়ত ঢেউ’
শহুরে রাত, যেন
সতর্ক প্রহরী, ঘুমোবার ইচ্ছা হলেও, ঘুম আসলেও
তাঁকে ছুটি দিতে হবে হুইসেলের ফুঁ-তে। অবশ্য এমনিতেও এই শহরের রাতে গলিত মদের আহবান, মিথ্যে শীৎকারের খুনসুটি আর অবাধ্য নিয়নের অত্যাচার কখনই কাউকেই ঘুমোতে
দ্যায় না, এই শহরে মানুষ শুধু
ঘুমানোর অভিনয় করে।
‘কে?’
‘হয়ত অন্য কেউ!’
ছুরি চালিয়ে কে যেন কেটে আনে আঁধার, দরদর শব্দে তালুভরা কান্নার দলা খসে পড়ে আগুনের আয়নায়।
প্রতিচ্ছবি কাঁপে, কাঁপে বাতাসের ঘের। শ্বাসের খাঁচায় বন্দী অগোছালো মেঘ।
‘কে? কে?
কে সে?’
‘কেউ নয়।’
‘তোমার অধর থেকে ধার দেবে একটু লোবান?’
‘এখন তো সিজোফ্রেনিক
অভ্যাসের মতো পাশে কেউ বসে নেই, তাহলে? কিভাবে আলোর স্রোতে ভাসবে ভোর? কিভাবে উপসর্গ পেরিয়ে আসবে ইঙ্গিতময় সুখ, কিশোরীর বাড়ন্ত নখের ইশারা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে শয্যাপাশে?’
মোবাইলের মৃত স্ক্রিন হেসে ওঠে সহসা। নীলাভ একটা সংকেত ছুটে আসতে চায় মেঘের দিকে। আকাশের বুকে
বাড়িয়ে দেয়া হাতটা পুনরায় নিজের ভেতর ফিরিয়ে এনে জানালার গ্লাস টেনে দিয়ে সাময়িক বিচ্ছেদ আঁকে মেঘ। জারিকৃত সংকেতের দিকে এগোতে এগোতে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে
নেয় সময়ের কাঁটা, ভাবনার ভেতর একটা আশংকা মোচড় দিয়ে ওঠে।
দুই
এ নিয়ে পরপর তিন দিন নিরাশ হতে হল। একা একা বসে থাকা। ঘণ্টা
খানেকের মধ্যে তিন কাপ কফির সাথে হৃদ্যতা এবং বিচ্ছেদ। এই সময়টাতে মেঘের পাশে বসে
থাকে অক্ষম ইজেল, নির্বাক তুলি আর বন্ধ্যা রঙ। প্রস্তুতির মাঝেও সীমাহীন অপ্রস্তুতি, মেঘ বিরক্ত হয় না- বিরক্ত না হবার মাঝেও আছে বিস্তর আনন্দ।
এই কফি শপেই প্রথম দেখা। এমনই এক নিরীহ বিকেলে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এক তরুণের
শুকনো কণ্ঠনালী পেরিয়ে একটি নাম পৃথিবীর বায়ুতে মেয়েটির অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল।
মেঘ নিজের মনোযোগকে সংকুচিত করেছে, ছুঁড়ে
মেরেছে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা তরুণের কণ্ঠস্বরের দিকে, যাকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছিল লক্ষ্য ছুঁতে না পারা তার
একজোড়া সচল দৃষ্টি।
মেয়েটির গোল চশমায় ঢেকে রাখা সঙ্ঘবদ্ধ দৃষ্টিসীমানা থেকে টিকরে বেরুচ্ছে
আত্মবিশ্বাস, যার
মাথা দোলানোর ভঙিমায় শাসনের সমূহ ইঙ্গিত, যে দুই ধাপ পেছনে হটে যাওয়াকেই ধরে নেই সম্ভাব্য বিজয়ের
নিশ্চিত সংকেত হিসেবে। সে
কী জানে, নারীর ছায়ায় বেড়ে ওঠা শুধু শিশুদের আকাঙ্ক্ষা
নয়, এই আকাঙ্ক্ষা পুরুষেরও।
নামটি কিন্তু বেশ! নাম সুন্দর হবার চাইতে নামটি যাকে ইঙ্গিত করে সেই মানুষটি
সুন্দর হওয়া জরুরী। পরপর তিনদিন মেঘ নিজেকে
অভ্যাস বহির্ভূত অভ্যাসে ব্যস্ত রেখেছে। কিছুটা শঙ্কিত, কিছুটা উদ্ভ্রান্তও। এই অবস্থার সাথে মানিয়ে নেবার চেষ্টায়
কিছুটা সফল, নিজেকে
ধন্যবাদ দিতে ভুল করে না সে, কিছুটা ধিক্কারও কি প্রাপ্য নয়?
চতুর্থে নয়, পঞ্চমেও
নয়- কাঙ্ক্ষিত সাফল্য কথা হয়ে ফুটে ষষ্ঠ দিনে। পাশের সেই অনাশ্রয়ী তরুণ লাপাত্তা। খুব
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, মেঘ যে টেবিলে বসে আছে- সেই টেবিলের ফাঁকা চেয়ারটায় এসে বসল মেয়েটি। ফাঁকা চেয়ার; ঠিক সামনের চেয়ারটাতে, দৃষ্টাদৃষ্ট ভঙ্গিমায়। মেঘ নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিলো, এমন একটা পরিস্থিতির প্লটই তো গত ছয়দিন থেকে এঁকেছে সে।
‘খুব প্রতিশোধ পরায়ণ আমি।’
‘জানি’
‘মানে?’
‘এই যে আপনি খুব প্রতিশোধ পরায়ণ।’ উঠে দাঁড়ায় মেঘ, ‘একটু বসুন, প্লিজ।’ বলেই কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়, এক কাপ কফি নিয়ে ফিরে এসে বসে।
‘গত কয়েকদিন ধরে আপনি যা করছেন তা এক কথায় বেয়াদবি।’
‘ঐ যে ওইদিকে একটু তাকান তো।’
‘কেন? কি ওখানে?’
‘কিছু দেখছেন?’
‘হ্যাঁ’
‘কি দেখলেন?’
‘আপনার সাথে গল্প করার জন্য এখানে এসে বসিনি আমি।’
‘জানি, প্রতিশোধ নেবার জন্য এসেছেন তো?’
‘কি দেখাচ্ছিলেন যেন?’ রাগের থালায় থমথমে সুন্দরের পশরা।
‘ঐখানে, ওই যে ওইখানে…’ মেঘ ইশারা করে, মেয়েটি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবার চেষ্টা করে, তার ঠোঁটের আশ্রয়ে কফি কাপটা যথেষ্ট স্বস্তি বোধ করছে একথা
নির্দ্বিধায় বলা যায়।
‘হ্যাঁ, রডোডেনড্রোন, ডার্ক পার্পল কালারের...’
‘খুব সুন্দর, তাই না?’
‘কিন্তু আপনি প্রসঙ্গ পালটাচ্ছেন কেন?’
‘বারবার দেখতে ইচ্ছা করে, বারবার, তাই না?’
‘আরে রাখেন আপনার সুন্দর।’
‘বারবার, বারবার দেখতে ইচ্ছে করছে।’
‘দেখুন, কে আপনাকে নিষেধ করেছে…’
‘আমরা এই যে বারবার ফুলটাকে দেখছি, সুন্দর বলছি, ফুলটা কি মন খারাপ করছে?’
‘কী আশ্চর্য!’
একশ একুশ নাম্বার রোডের ‘ক্যাফে ওয়ান ও এইট’-এ মাঝেমাঝেই বসে মেঘ এবং
অবধারিতভাবেই একা। কফি শপটা দারুণ, শপ তো নয় আসলে একটা পুরনো বাড়ি। সামান্য কিছু রেনোভেশন করে
এর গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে কফিশপের ট্যাগ। গেট পেরিয়ে ঢুকলেই একটা ফাঁকা জায়গা, ছোট্ট একটা ফুলের বাগান।
‘যদি ঐ ফুলের চেয়েও সুন্দর কিছু আপনাকে মুগ্ধ করে?’
‘দ্যাখেন, কে আপনাকে নিষেধ করেছে।’
‘তাহলে প্রতিশোধ ক্যানো?’
‘মানে? আর ইউ কিডিং মী? রডোডেনড্রোন আর আমি এক?’
‘নো, এবসলিউটলী নট। ইউ আর মোর দ্যান দ্যাট।’
‘ইউ জাস্ট ক্রসিং ইয়োর লিমিট।’
‘গত কয়েকদিন ধরে ঐ ডার্ক পার্পল কালারের রডোডেনড্রোনের চেয়েও
অনেক সুন্দর কিছুর দিকে তাকিয়েছি, এটা আমার অপরাধ? ইফ ইট ইজ, দেন পানিশ মি। প্লিজ।’
‘ইউ আর আ টোটাল রাবিশ।’ থরথর কাঁপছে সৌন্দর্য- রাগের আয়নায়
উতলে উঠছে নিজস্ব ভঙ্গিমায়।
তিন
অল্প দিনেই সম্পর্কটা একটা রঙ পেতে যাচ্ছিলো। এক আশ্চর্য নীরবতা আর বোঝাপড়ার
মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল সবকিছুই।
‘আমি ক্যাফেতে…’স্বভাব বিরুদ্ধ স্বরে মেঘকে ‘ক্যাফে ওয়ান ও
এইটে’ ডেকেছিল, মেয়েটির
স্বরে প্রাণের অনুপস্থিতিই বলে দিচ্ছিল সুতোয় টান পড়ার আকস্মিক সম্ভাবনার কথা।
‘কি ব্যাপার?’ আজ পৃথিবীর মুখে কেউ অন্ধকার ছিটিয়ে দিয়েছে? মেঘের মনে সীমাহীন শঙ্কা, আর ভয়।
‘বসো…’ রামধনু হারিয়ে যাবার পূর্বমুহূর্তে আকাশ যেমন
নিঃশব্দের মাঝে নিজেকে সমর্পণ করে ঠিক তেমনি অবস্থা তার।
‘ইউ লুকস গ্রেট… কি হয়েছে জানো?’ মেঘ নিজেকে বৃষ্টি হিসেবে ঝরাতে চাইছে, যদি পরিবেশটা একটু হালকা হয়।
‘বসো, প্লিজ’ মুখ তুলে তাকায়, মেঘকে ইশারায় সামনের সীটে বসতে বলে।
‘কফি?’
‘না’
‘কি হল?’
‘বসো’
‘হু’
তার এমন চেহারা এর আগে কখনই দেখেনি মেঘ, কেমন অস্বাভাবিক, আড়ষ্ট। হ্যাঁ, গত সপ্তাহেই তো ওদের বাসায় গিয়েছিল মেঘ। ওর বাবা-মায়ের সাথে
আলাপ করিয়ে দিয়েছে।
‘তোমাকে কিছু কথা বলব, শুধু শুনবে, উত্তর দিতে পারো, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারবে না।’
‘বলো, কি বলবে?’ ভেতরে
ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে নারাজ। ভাবনার ডানায় বাতাস
লাগায় মেঘ, কিন্তু
তার ভাবনারা উড়তে পারে না, মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
‘আমাদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এবং, নির্দ্বিধায় বলা যায় এই সম্পর্ক একটা নতুন অর্থপ্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু; আজ, এই মুহূর্ত থেকে এই সম্পর্কটা অতীত। কেন কি কারণে এমন প্রশ্ন করবে না, এর কোন উত্তর নেই।’
‘মা-নে?’ মেঘের মুখ থেকে আর কোন শব্দ বেরোয় না, কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না- সে ভালো করেই জানে মেয়েটি একবার
যে কথা বলেছে সেখান থেকে একচুলও সরে আসবে না।
‘এ নিয়ে আমি কোন আলোচনা নয়…’
‘কি-ন্তু…’
‘মেঘ, আমরা দাবি করি পৃথিবীটা আমাদের, এটা মিথ্যে; ভেবে নাও এই মিথ্যের কুয়াশা আমাদেরকে একে অন্যের থেকে আড়াল
করে দিয়েছে।’
‘প্রথম দিনেই তুমি বলেছিলে, খুব প্রতিশোধ পরায়ণ তুমি, প্রতিশোধ নিলে? এইভাবে? আমার সমস্ত পৃথিবীকে কেড়ে নিয়ে, আমাকে নিঃস্ব করে? বলতে পারো আমি আর কতবার নিঃস্ব হবো?’ জন্মের পরেই কাঁদার অভ্যাস ভুলে গেছি, তবু; কান্না আসছে আজ, কিন্তু না কাঁদবে না মেঘ।
‘মেঘ আমাদের চেয়েও সময় সবচেয়ে বড় প্রতিশোধপরায়ণ, আমরা শুধু ক্রীড়নক।’ এই মেয়েটিকে চেনে না মেঘ। ‘আরেকটা কথা, আমি নেক্সট উইকে ইউএস চলে- যাচ্ছি, হয়ত আর কোনদিনও ফিরবো না। ওখানে যাবার কয়েকদিনের মধ্যেই
আমার আর সঙ্গীতের বিয়ে।’ অবলীলায় কথাগুলো বলে যাচ্ছে সে।
মেঘ কি বলবে, এমন সিচুয়েশানে কি বলা উচিৎ ভেবে পায় না। তার ভেতরের সেই পুরনো ঘৃণাবোধ মাথা
চাড়া দিয়ে ওঠে। যদিও সে বিশ্বাস করত সবাই এক রকম নয়, হতে পারে না; হতে পারে না বলেই মেয়েটিরকে ভালো লেগেছিল তার। তিন তিনবার
কফি নেয়া হয়েছিলো, কিন্তু প্রতিবারই কফি কাপ দুইটা চুমুক বঞ্চিত ছিল।
‘দেখেছো? রডোডেনড্রোনগুলোও কাঁদছে...’ মেঘ চোখ ফেরায়, বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘যা-চ্ছি… ভাল থেকো’ যাবার পূর্বে মেঘের হাতদুটোকে শেষবারের
মতো নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ রেখেছিল মেয়েটি।
মেঘ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিল, ‘মেয়েরা সম্পর্ক পাল্টানোর সাথে সাথে সবকিছুই পালটে ফেলে? স্পর্শ, চাহনি, তাদের কথা বলার ধরণ? সব, সবকিছুই?’
এরপর থেকেই একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে মেঘ, নিজের সম্মতিতেই। কেউ নেই আগলে
রাখার,
নেই বলেই ডুবে যাচ্ছে সে। এই সম্ভাব্য ডুবে যাওয়া
থেকে বাঁচাতে পারবে না
তাকে। কেউ ইচ্ছাকৃত ডুবে যেতে চাইলে অন্য
কারো সাধ্য নেই কাউকে বাঁচিয়ে তোলার। এক অন্যায্য ঢেউয়ে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘ।
কোনও কিছুই সহ্য হইয় না, এমনকি নিজেকেও না। ভেবেছিলো, একসময় সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি, যায় না, যায় না বলেই বেঁচে আছে মেঘ।
চার
‘তুমিও অন্যদের মতোই ধোঁকা দেবে...?’
‘দিতেও পারি, তবে হয়ত দেবো না...’
‘আমিও দেখতে চাই কতজন আমাকে কতভাবে কষ্ট দিতে পারে, দেখিই না...’ মেঘের গলা ধরে আসে, কিন্তু সে এটাকে লুকিয়ে ফেলে।
‘মেঘ, তুমি কাঁদবে? একবার কাঁদো... দেখবে হালকা লাগছে...’
‘না’ জন্মের সময় মেঘ কেঁদেছিল কি না জানে না, তবে এরপর আর কাঁদে নি।
‘কাঁদো, তোমার সারা জীবনের জমানো কান্না; সব ধুয়ে মুছে যাক, কাঁদতে কাঁদতে তোমার সব কষ্ট, সব দুঃখ একেবারে সাফ হয়ে যাক, কাঁদো ...’ এই বলে নিজেই কাঁদতে আরম্ভ করে রুমু, জড়িয়ে ধরে মেঘকে।
‘আরে, তুমি কাঁদছ ক্যানো? তুমি তো আমাকে কাঁদতে বললে। তোমাকে একটা গল্প শোনাই?’ কান্না থামে না রুমুর, থামবে বলে মনেও হয় না। আচ্ছা, কাঁদুক। যতক্ষণ ইচ্ছে কাঁদুক।
মেয়েটির চলে যাবার পর যাচ্ছেতাই জীবনের ভেতর নিজেকে ছুঁড়ে মেরেছিল মেঘ। অনিয়মই
তাঁর কাছে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবকিছু থেকে নিজের সমস্ত আগ্রহকে প্রত্যাহার করে
নিয়েছিলো সে। বারবার ঘুরেফিরে তার মনে একটাই প্রশ্ন, ‘কেন এমন করল সে?’ নিজের প্রতি সমস্ত ভালোবাসা একসময় ঘৃণায় পরিণত হল, সেই পুরনো ঘৃণা, যা কিনা এতদিন মৃত আগ্নেয়গিরির মতো ঘুমিয়ে ছিল, সেটা পুনরায় নতুনভাবে সামনে এলো। আসলেই সব নারীই একইরকম, নিজেদের স্বার্থ ব্যতীত এরা কোনকিছুই বোঝে না, কোনদিন বুঝবেও না।
যখন নিজের প্রতি সমস্ত আস্থা হারিয়ে ফেলে মেঘ নিজেকে নিঃশেষ করার সমস্ত আয়োজন
প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে ঠিক তখনই রুমু আসে তার জীবনে। স্মৃতি মেঘের মনে এক
অস্বস্তিকর আলোড়ন তোলে, মেঘ নিজেকে সরিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু পারে না, রুমুই পারতে দেয় না। নারীরা যখন ভালোবাসে তখন সমস্ত কিছু
উজাড় করে ভালোবাসে; যখন নিজেকে উইথ ড্র করে তখন খুব নৃশংস হয়ে ওঠে, মেয়েটির কথা ইদানীং মনে করতে চায় না মেঘ। ব্যথারপাঠ্য থেকে
মুছে ফেলার জন্য যা যা করা লাগে তাই করতে প্রস্তুত মেঘ; রুমু সেই প্রস্তুতির সর্বশেষ প্যারা।
পুরনো ভাবনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায় মেঘ, কতক্ষণ সেই জগতে ছিল মনে নেই, যখন ফিরে এলো, দেখে তখনও কাঁদছে রুমু। নিজেকে দোষারোপ করতে পিছপা হয় না
মেঘ। খুব অন্যায় করছে সে, রুমু,
রুমুর বাসর রাত আজ। এমন দিনে এই মেয়েটির আবেগ নিয়ে খেলা
করতে চায় না মেঘ। এই মেয়েই তো সেই মেয়ে যে হারিয়ে যেতে বসা মেঘকে হারিয়ে যেতে দেয়
নি। রুমুর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই মেঘের। রুমুর সাথে খুব অল্প দিনের সম্পর্ক।
রুমুর জেদ আর মেঘের বাবার জোরাজুরিতে হুট করেই এই বিয়ে।
রুমু,
রুমু মেঘের বিবাহিত স্ত্রী, মেয়েটি, না সেই মেয়েটি কেও নয়। মেয়েটি মেঘের জীবনের এক কালো অধ্যায়-
যে নিজের স্বার্থে এক কথায় মেঘের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছে।
‘নদী’র কথা ভাবছ?’
রুমু মেঘের মাথাটা খুব যত্ন সহকারে নিজের কোলে তুলে নেয় রুমু, মেঘের কপালে গাঢ় একটা চুমু খায়, বলে ‘বলেছিলে না গল্প শোনাবে? তুমি না, আমিই তোমাকে গল্প শোনাই...’
অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে মেঘের ঘরটা। পুরো ঘর জুড়ে সাদা বেলি ফুল ছড়ানো, সাদা চাদর, তার উপরেও ছিটানো বেলি ফুল। বাসরে রুমুর জন্য সাদা গাউন, মেঘের জন্য সাদা পাজামা পাঞ্জাবী। এই প্লান রুমুর।
রুমু নিজের কোলে রাখা মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মেঘকে বলে, ‘প্রায় তেইশ বছর আগেকার ঘটনা, এক সদ্যজাত শিশু সন্তানকে কে বা কারা ফেলে রেখে এসেছিলো
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন রেললাইনের উপর। ঊনত্রিশ বছর বয়সী এক যুবক, মাত্রই ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন, খুব ভালও করছিলেন... তিনিই সেই শিশু সন্তানটিকে কুড়িয়ে নিয়ে
এসেছিলেন,
সেই সময়ে এই ঘটনাটা নিয়ে খুব শোরগোল হয়েছিল। পেপার পত্রিকা
এমনকি একাধিক টিভিতেও এ নিয়ে রিপোর্ট হয়েছিল... ধারণা করা হয়েছিল কোন এক কুমারী মা
তার সদ্যজাত সন্তানকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, এই ঘটনার পর সেই ব্যাবসায়ী যুবক রীতিমত নায়ক বনে যান।
কিন্তু যা হয়, কয়েকদিনেই
সব উন্মাদনা শেষ। সেই যুবক পরে আর বিয়ে থা করেননি, কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানকেই নিজের সন্তান হিসেবে মানুষ করতে
থাকেন,
এর আগে আইনগত জটিলতা এড়াতে সমস্ত পেপারস তৈরি করে নেন
তিনি...’
‘রু…মু...’ এর বেশী কোন শব্দ বের হয় না মেঘের কণ্ঠ
থেকে।
মনে হচ্ছে পৃথিবীটা সংকুচিত হয়ে আসছে মেঘের জন্য, নিঃশ্বাস ফেলতে না পেরে মৃত্যুর দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে
সে। পরম আদরে মেঘের মুখটাকে দুই হাতের তালুতে তুলে নেয় রুমু। কিছু বলতে পারে না
মেঘ। তাকিয়ে থাকে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রুমুর মুখের দিকে।
‘এসব কথা কে আমাকে বলেছে জানো? শেষবার আমেরিকা যাবার পর আর ফেরেনি ওরা, ওদের ডুয়েল সিটিজেনশীপ। মাঝেমাঝে এখানে থাকত, মাঝেমাঝে ওখানে। তবে ওর মা, নীরু আন্টি বেশীরভাগ সময়েই বাংলাদেশে থাকতেন, তোমার মনে আছে নিশ্চয়; তুমিতো একদিন
ওদের বাসায়ও গিয়েছিলে।’
‘হ্যাঁ, মনে আছে।’
‘নারী কখনই সম্পর্ক থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে না, পুরুষই তাদের বাধ্য করে সম্পর্ক গড়তে, পুরুষই বাধ্য করে সম্পর্ক ভাঙতে...’
‘আণ্টি কেমন আছেন?’
‘এবার এখান থেকে যাবার সময় উনাকে খুব অসুস্থ দেখেছিলাম।
যাবার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই নীরু আন্টি মারা গেছেন... মেঘ, নীরু আন্টিই তেইশ বছর পূর্বের সেই কুমারী মা, যার বুক থেকে তার বড়লোক বাবা তার সন্তানকে কেড়ে সকলের
অগোচরে ফেলে এসেছিলেন রেললাইনের উপর।”
‘মা!’এর বেশীকিছু বলতে পারে না মেঘ, চোখের কোণা বেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ে শীতল অশ্রু, সেই অশ্রুতে সিক্ত হতে থাকে পৃথিবীর উষ্ণ মুখমণ্ডল।
.png)
0 Comments