বোধ
লোহার হাতল ধরে বসে আছে একজন বয়স্ক প্রাণী। বয়স কতো হবে? ৮০ এর বেশি। শুকনো মৌসুমের ইরি ক্ষেতের খাঁদের মতো মুখের বলিরেখা। মনে হচ্ছে, উদ্দাম যৌবনের স্মৃতি ভাঁজ করা ওই তামাটে ত্বকের ভাঁজে। আমিষহীন চোখ দুটি শিশুর মতো তাকিয়ে আছে। অসহায় দৃষ্টি। ঠিক কয়েকহাত দূরে টেবিলের উপর পানির গ্লাস। বৃদ্ধ নড়তে পারছে না। চারপায়ের এই চেয়ারটায় যেন আটকে গেছে তার পৃথিবী। টেবিলটা যেন সৌরজগতের বাইরে- আলোকবর্ষ দূরে। এমনই মনে হচ্ছে তার কাছে। ধীরে ধীরে সবার কাছে অভিকর্ষহীন হয়ে উঠছে। আশেপাশে সবই গতিশীল। অথচ বৃদ্ধের পৃথিবী এই গতিশীলতা থেকে যোজন যোজন দূরে। ইশারা দিয়েও কাউকে বলবে এমন শক্তিও পাচ্ছে না। তার কাছে মনে হলো চেয়ারটাই তার জগত। চারিদিকে এত শোরগোল কোন কিছুই তার কানে আসছে না। বরং শব্দ তার জগতের নীরবতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই নীরবতা ভয়ংকর। বৃদ্ধের কাছে মনে হলো একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসে আছে। এই ত্রিমাত্রিক জগতে তার কোন মাত্রা নেই, নেই কোন ব্যাস বা পরিধি, শুধু একটা বিন্দুর মাঝে বসে আছে। চোখে শিশুর মতো চাহনি। তবে কৌতূহল শূন্য। " আপনার কি কিছু লাগবে?" আশেপাশের মানুষের প্রশ্ন। আসলেই কি কিছু বৃদ্ধের দরকার? হ্যাঁ। একটা ঘুম --চিরকালের জন্য। সে হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। একটা গভীর খাদ ত্বকের মাঝে লুকিয়ে আছে--বিশাল শূন্যতা নিয়ে। 'আপনাকে কমলা দিই? জুস?' বৃদ্ধের কি এসব আসলেই দরকার? না মৃত্যুই এখন সবচেয়ে মোহময়? স্ত্রী, কন্যা, পুত্র --সবাই কাছে। তাদের শব্দগুলো কানে পৌঁছলেও হৃদয় অনুবাদ করতে পারছে না। বৃদ্ধের মনে হলো সে কারোরই নয় এখন। একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এটা H`2`0 নয়। এটা কি হতে পারে? মায়া, ভয় --সবকিছু হারিয়ে ফেলার? আসলেই কি কিছু বৃদ্ধের ছিল? না আছে? এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে ৮০টা বছর অর্থহীন একটা জীবন কাটিয়েছে। তার এই অসহায়ত্ব আর চারিদিকে অসংখ্য চোখ উলটো কৃষ্ণগহব্বরের মতো গিলে খাচ্ছে। তার কাছ থেকে ছিনিয়ে জীবনী-শক্তি। এটাই কি তাহলে এন্ট্রোপি--সবকিছু ক্ষয় হয়, হওয়া দরকার বিবর্তনের জন্য? এবং স্রষ্টার বিধান? আহা প্রকৃতি! "ও মানুষ, তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসো!' কে বলেছিল প্রথম কথাটা? কেন ভালোবাসে? ঘাসের উপর শিশিরের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মতোই তো জীবন। তবুও মানুষ মায়ার বন্ধনে জড়ায়, কাঁদে, কাঁদায়।বৃদ্ধের চারপাশে মানুষ। ঠিক মানুষ নয়, মানুষের নৈঃশব্দ্য, --আর ভরহীন পদার্থের মতো বৃদ্ধ জড়িয়ে চেয়ারে যেন মহাবিশ্বের মহাশূন্যে কোথাও।
অনু
শান্ত স্নিগ্ধ দিঘিতে একটা ঢিল ছুড়ে দিলে যেমন জলের কাঁপুনি উঠে তেমনি আমি যখন তার চোখে চোখ রাখলাম তার মুখে এক হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো। তারপর আবার সেই দিঘির জলের মতো শান্ত ও নিবিড় একটা ভঙ্গি। রোগীরা আসছে,যাচ্ছে। তবুও তার মাঝে একধরনের নির্লিপ্ত, শান্ত ভাব ঠিকই আছে। তবে এতে কোন উদাসীনতা নেই। বরং এক বৌদ্ধিক ভঙ্গিকে বসা। সে সবসময়ই এরকম ছিল---প্রেমে, প্রত্যাখানে, প্রতিশোধে, দায়িত্বে সমানভাবে ডিডিকেটেড। সে যদি প্রাচীনকালে জন্ম নিতো সেনেকা কিংবা বুদ্ধের চেতনা লাভ করতো। এক অদ্ভুত ফটোগ্রাফিক মেমোরি তার। আশেপাশে কী ঘটছে সিসিটিভির মতো রেকর্ডেড। রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে হাসিও দিচ্ছে। তবে আমার কাছে মনে হলো, আমাকে দেখে যে হাসিটা দিল--এই হাসিটা সে দীর্ঘদিন ধরে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। যেমন কোন কিশোরীর পুরোনো ডায়েরিতে যত্ন করে রাখা গোপন এক চিঠি। তার মাঝে এতো বছরের ভেতরও কোন পরিবর্তন নেই। পরিবর্তন যা, চুলে একটু হাল্কা ব্রাউনিং করা সামনের দিকে। সাজগোজ কখনই তেমন করত না, তবুও ভারতীয় দক্ষিণা নায়িকাদের মতো হতবিহ্বল করার মতো সৌন্দর্য ফুটে উঠতো চেহারায়। কিন্তু বলা হয়, অভিযোজনের জন্য মানুষ বিভিন্ন বয়সে পরিবর্তন হয়। তার ক্ষেত্রে ভিন্ন। অনু ছাত্র অবস্থা থেকেই বুদ্ধিতে চৌকস, প্রজ্ঞায় দীপ্ত আর অসাধারণ সেন্স অব হিউমার ছিল। ও আচ্ছা, বলে নিই, আমার সামনে যে বসা তার নাম অনু। হার্ট স্পেশালিস্ট। হৃদয়ের ক্ষত থেকেই হয়তো এ পেশা বেচে নেয়া। আমার এখানে আসা কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝরাতে হঠাৎ ফোন আসে দেখা করা আর্জেন্ট। না হলে কারো অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। সে কি বিবাহিত? স্বামী ঘুমিয়ে পড়ার পর কি গোপনে ফোন দিয়েছিল আমাকে? তার স্বামী কি আমাদের বিষয়টা জানে? পুরুষ আর যাই হোক, তার স্ত্রীর কেউ ছিল সেটা সহ্য করতে পারে না। নিজেরা কুমার নাও হতে পারে। তবে সে চায়, তার নারী একজন ভার্জিন থাকুক। তার কি ছেলে মেয়ে আছে? এই কয়েকঘন্টায় স্বামী কিংবা সন্তান কারোই তো ফোন আসেনি। তাহলে হয়তো স্বামী সন্তান কেউই নেই। তবে টেবিলের উপর মোবাইল রাখা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখ বুলাচ্ছে। তাহলে কেউ একজন আছে যার ফোন আসতে পারে। চিন্তার বিষয় আমাকে রেস্টুরেন্ট, পার্কে না বলে চেম্বারেই আসতে বলল কেনো। এবং এখনও জানলাম না কী ক্ষতি হবে কিংবা কারই বা। এদিকে বিনা অপরাধে তার দিকে তাকিয়ে থেকে তিনঘন্টার একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিল্ম দেখার মতো 'মনোরম মনোটনাস' শাস্তি ভোগ করতে লাগলাম।
.png)
0 Comments