জিললুর রহমানের কবিতা



পাহাড়ে একদিন 

পাহাড়ের গা বেয়ে যে ঝরনা নেমেছে 
এখন তা খটখটে শুকনো খাঁড়ি 
আমরা ভাবতে থাকি এই জল 
কোন্ পথে আসে তার হদিস খুঁজতে হবে, 
আমরা এগিয়ে যাই পাহাড়ের খাঁড়ি ধরে 
চড়াই উৎরাই বেয়ে ঘন অরণ্যের দিকে 
পাহাড়ের অদেখা চূড়ার পথে। 

ভেবেছি পাহাড়ে খুব উঁচু থেকে দেখে নেবো 
নিজের নীচুতা যত, 
তারপর যেতে থাকি বহুদূর খাড়া খাড়া পর্বতের ‘পর। 
দেখি না নিচুতা কিংবা উচ্চতার কোন ভেদ, 
কেবল জঙ্গল দেখি - 
গাঢ় অন্ধকার ঘিরে রাখে চারপাশের অনন্ত সবুজ…


চলো, সবে মিলে… 


কী অদ্ভুত শিহরণ! 
জেগে ওঠে ভেতরের পশু 
খ্যাত-বিশ্ববিদ্যালয়ে, 
পৌরুষ সুতীব্র আজ ছাত্রাবাসে। 
জ্ঞানটুকু জমা রাখি পরীক্ষার খাতার পাতায়। 
নারীকে রমণী জেনে ভোগ করি হলের কোঠায়। 
যদিও দ্রৌপদী নন, স্বামী নয় পাণ্ডবের কেউ 
দুঃশাসন দুর্যোধন আছে— আছে শকুনির চাল। 
 
আর কত ধৃতরাষ্ট্র থাকি, আর কত সাজবো গান্ধারী, 
অর্জুনের তো বৃহন্নলা দিন, কন্ঠ দিনে দিনে হচ্ছে ক্ষীণ;  
বীরভোগ্যা বসুন্ধরা যেথা, 
সভ্যতা সেখানে বুঝি দুর্বলের গান!


রুমির সঙ্গে ঘুরতে যাই না কতোকাল 


চারদিকে গনগনে সূর্য, 
চারদিক ঝকঝকে শুনশান, 
রুমির সঙ্গে ঘুরতে যাই না কতোকাল। 

বাচ্চারা ছটফট করছে ঘরে, 
মাঠগুলো খালি পড়ে আছে— 
কেবল দুটো কুকুরছানা আর একটি পরিচ্ছন্ন কাক; 
বাচ্চাদের খেলতে দিই না কতোকাল।

বাইরে বাতাসে প্রেম, রিকশার ঝুনঝুনি ডাকে, 
আমার পা’ দু’টো চেরাগী ছুটতে চায়, 
আমার এ চোখ দু’টো সাগরের ঢেউ গুনতে চায়,
রুমিকে পাহাড় দেখাবো বলে 
ব্যাকপ্যাক বেঁধেও রেখেছি বহুদিন।

কোথাও বৃষ্টির নেই ছিটেফোঁটা, 
কোথাও মেঘের নেই আনাগোনা,  
রুমিকে দু’চোখ দিয়ে ডাকি —
রুমিকে স্পর্শ করি না কতোকাল!


সাকুরা গাছের নীচে 
 

সাকুরা গাছের নীচে দুপুরে ঝলক ওঠে প্রতিদিন,
দুপুরে এতোটা রং এর আগে এভাবে ধরেনি।প্রতিবসন্তের শেষে কতো গ্রীষ্মে সাকুরা গাছের ফুল 
ঝরে ঝরে পড়ে গেছে কতো ফুল, 
দলেছে কিশোর শিশু যুবক যুবতী প্রেমমগ্ন কতোজন। 
এমন দুপুর শুধু এবছরই এলো, 
এবছরে ভরেছে বাতাস বিষে 
চারপাশে অবিরত মানুষের মৃত্যু ধেয়ে আসে 
এমন দুপুরে আজ সাকুরা ফুলের রং 
আরো বেশি ঝলসে দিয়ে এসেছে হরিণ শিশু 
হরিণী ও কর্তা হরিণেরা দলে দলে আসে 
 
নারা হরিণের দল কখনোবা হাল্কা চালে 
কখনো অলস পায়ে ঘোরে 
কেউ কেউ জিরিয়ে নিয়েছে লীলাছলে 
কোনো মানুষের পুত্র কন্যা এসে বিরক্ত করেনি আজ। 
আজ সব মানুষেরা, চকিত চঞ্চলা মানুষীরা, 
বিষণ্নতা রোগের শিকার।
বসে আছে প্রকৃতি বিমুখ ঘোরগ্রস্ত মুখ মাথা ঢেকে, বহির্বিশ্বটাকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে ভাবনায় অন্তর্লীন।

প্রকৃতি সুন্দর হলে হরিণেরা উল্লসিত হলে 
প্রজাপতি আরো বেশী রং গায়েতে জড়ালে 
মানুষের শিশুদের কী যায় কী আসে!
যখন ভরেছে আজ মানুষ মারার বিষ বাতাসে বাতাসে,  
নি:শ্বাসের আয়ু ঝরে রাত্রির গভীর অন্ধকারে, 
ওড়ে পত পত মানুষের প্রাণগুলো দেহখাঁচা ছেড়ে 
মথ হয়ে উড়ে যায় সে কোন্ বেঘোরে ...


২০০০ বছর পরে 


রোবট-রাজত্ব চলছে বহুকাল। মানুষের সাথে টেক্কা দিয়েছে সংখ্যায়। গাছে ফুল ফুটেছে কি ফোটে নাই, তাতে ওদের কিছুই আসে না, যায় না। মানুষও এখন আর গন্ধ শোঁকার সে অবসর পায় না কখনও। তবু ফোটে ফুল, গন্ধ বিলায়ে যায় হাস্নুহানা এবং গোলাপ।


উড়োজাহাজের চিল 


উড়ে গেল উড়োজাহাজের চিল দূরে, 
পেছনে সফেদ তার বাষ্পীয় লাঙুল, 
আকাশে দিয়েছে কিছু বেখেয়ালে ছুঁড়ে, 
ভেবেছি উড়ন্ত এক গন্ধরাজ ফুল! 

Post a Comment

0 Comments