সাজ্জাদ সাঈফের গল্প



দুই মহলা বাড়ি


একটা চন্দ্রমল্লিকার ঝাড় ঠায় দাঁড়ায় ছিলো আঙ্গিনার বায়ে, সেইদিকে জোড় বেঁধে কিছু ভাত-শালিখ এই তাগদ-সকালেই ঘুরতেছে ইতিউতি। এই বাড়িটা যুদ্ধের আগে তৈরি। মাসুমের বাপ তাঁর বড়ভাইসহ ঢাকায় তখন নতুন চাকরিতে আসছে। দুই ভাইয়েই মায়ের লগে আলাপ কইরা বাড়িটা করে। তখন তো মিরপুর জলা-জঙ্গল। এর মধ্যে এই জায়াগাটা সেই সময় বেশ উঁচাই আছিলো। এখন যত বিল্ডিং বাড়ি এর চারধারে এরা কিছুই আছিল না। মাসুম-মাসুদ, তাঁদের বাবা অধ্যাপক শামস মোমিন সাহেবের জীবদ্দশায় এই বাড়ির দুই ভাগ পাইয়া গেছিলো, সামনে গলিপথের মোড়। সুপার শপ। একে একে আর সব জমি এর চারপাশে উচ্চা দালান হইলো দিনকে দিন, এই বাড়ি সে-ই আছে। খোলা উঠান, ছোট বাগান, একটা দোলনা অব্দি আছে, শৌখিন বাপ-জেঠার খান্দান আরকি। অধ্যাপকের ছিলো কবিমন, তাঁর ভাই সহজ সরল লোক, দুই পরিবারই করে কিম্মে খেয়ে যেতে পারছে প্রায় তিন দশক হইবো। পরে অবশ্য জমির অংশ বিক্রি করে প্রাইমারি টিচার আল আমিন সাহেব গ্রামে ফিরা গেছেন রিটায়ারমেন্টে।

এখন এক বাড়ি দুই মহলা, মাসুমের ভিটা পিলারের ওপর দোতলা নিয়া আর মাসুদ সেই আগের রূপেই গেরস্থালি আগলায় রাখছে। তো এই বাড়িটা লইয়াই ঘটনা। মানে দুই ভাইয়ের ক্যাচাল। মামলা অব্দি যায়-যায়। পিলার তুইলা বাড়ি দোতলা করতে গিয়া গায়ে গায়ে লাগাইয়া দিছিলো দুই মহলারে মাসুমে। এহন ছাদে টিনশেড তুলতে গিয়া মাসুদ দেখে জানালা দিলেই ঠোকর লাগে, বায়-বাতাস কেমনে আসবো সেই টিনশেডে, এট লিস্ট দুই ফুট ছাড়ার কথা কইতেই মাসুম আগুন। ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদে পড়শিরা মজা লয় আরকি। শেষমেষ জীবিত জেঠা আমিন সাব আসছেন সালিশে। পারিবারিক সালিশ শেষ চেষ্টা কওয়া যায়। ঘরে আত্মীয় পড়শিতে ঠাসা সালিশে দুই ভাইয়ের কেউই নত হয় না, এই কথা সেই কথা গালিগালাজে ফাল দেয়।

এর মধ্যে আমিন সাব দুই ভাতিজারে ঘর থিকা বাইরে আনেন, বায়ের দিকে জোড়া চন্দ্রমল্লিকার ঝাড় আর বেশ হাওয়াই ছায়া দেইখা ঝাড়ের বেদির দিকে আগায় তারা। কি হইতে কি যে হয়, মুরব্বী মানার দিকেও ধাত নাই আজকালকার পোলাপাইনের, ভাবতে ভাবতে দাড়ির গোছা হাতান আমিন সাব। দুই পাশে মাসুদ-মাসুম গজরায়। থাইমা যান আমিন সাব, দুই ভাইয়েরে কিভাবে কইবেন তিনি, শেষে ডান হাতের তর্জনি তুইলা দেখান ঝাড়ের বেদির দিকে, বেদির সিমেন্ট ঢালাইয়ের গায়ে ছোট্ট একটা বাক্য, কি যে তেজ তার, চোখ ঝলসে যায় যায় দুই ভাইয়েরই, বুক কেঁপে ওঠে পাষাণ দুয়েরই, কি লেখা সেটা, আরেকটু জুম করি আসেন, আরেকটু, হ্যাঁ এইতো ক্লিয়ার- 'দুটা গাছই চন্দ্রমল্লিকা, আমার দু'বাপ মাসুদ-মাসুম এরা'।

আমিন সাবের বুকে ততক্ষণে শিল পড়া বৃষ্টির শব্দ, পাথর-সমান শিল!

Post a Comment

0 Comments